পাতাটি খোলা হচ্ছে...
স্থানীয় অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে রান্না করা ভাত-খিচুড়িতে মিলছে সিসা: গবেষণা
আইসিডিডিআর,বি ও যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, স্ক্র্যাপ ধাতু গলিয়ে তৈরি স্থানীয় অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে রান্নার সময় খাবারে বিষাক্ত সিসা মিশছে। নতুন হাঁড়িতে প্রথমবার রান্না করা খিচুড়িতে সিসার মাত্রা শিশুখাদ্যের মার্কিন সীমার প্রায় ৪২ গুণ পাওয়া গেছে।

দেশের ঘরে ঘরে ব্যবহৃত স্থানীয়ভাবে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিল থেকে রান্নার সময় খাবারে বিষাক্ত সিসা মিশছে বলে এক যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) ও যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এ গবেষণা করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন হাঁড়িতে এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি, আর স্টিলের তারের জালি দিয়ে ঘষে মাজলে সিসা বেরিয়ে আসার পরিমাণ আরও বেড়ে যায়।
‘টক্সিক কুকওয়্যার: লেড এক্সপোজার ফ্রম অ্যালুমিনিয়াম পটস ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামের গবেষণাপত্রটি গত ২৫ অক্টোবর জার্নাল অব এক্সপোজার সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল এপিডেমিওলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকেরা বাজার থেকে কেনা ২০টি নতুন হাঁড়ি এবং বিভিন্ন পরিবারে ব্যবহৃত সাতটি পুরোনো হাঁড়ি পরীক্ষা করেন। হাঁড়িগুলোতে ভাত ও খিচুড়ি রান্না করে পরীক্ষাগারে সিসার মাত্রা মাপা হয়।
আইসিডিডিআর,বির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পরীক্ষা করা প্রতিটি পাত্র থেকেই খাবারে সিসা নির্গত হয়েছে, তা নতুন হোক বা পুরোনো। নতুন পাত্রে প্রথমবার রান্নার সময় প্রতি কেজি ভাতে সর্বোচ্চ ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম এবং খিচুড়িতে সর্বোচ্চ ৪২০ মাইক্রোগ্রাম সিসা পাওয়া গেছে। অথচ শিশুখাদ্যে সিসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) নির্ধারিত সীমা প্রতি কেজিতে মাত্র ১০ মাইক্রোগ্রাম। সে হিসাবে ভাতে এই মাত্রা সীমার প্রায় ৩০ গুণ, খিচুড়িতে প্রায় ৪২ গুণ।
গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন হাঁড়ি স্টিলের তারের জালি দিয়ে ঘষে মাজলে না মাজা হাঁড়ির তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি সিসা বেরিয়ে আসে। ধাতব খুন্তি দিয়ে খাবার নাড়লেও সিসা মেশার পরিমাণ বাড়ে। টক বা অম্লধর্মী খাবারে ঝুঁকি আরও বেশি। কয়েকবার ব্যবহারের পর সিসার পরিমাণ কমলেও তৃতীয়বার ব্যবহারের পরও তা শনাক্ত হয়েছে। সাতটি পুরোনো হাঁড়ির ছয়টিতে রান্না করা ভাতেও সিসা পাওয়া গেছে।
গ্রামাঞ্চলের শিশুদের সাধারণ ভাত খাওয়ার পরিমাণ ধরে গবেষকেরা হিসাব করে দেখেছেন, এমন হাঁড়িতে রান্না করা ভাত খেলে একটি শিশুর দৈনিক সিসা গ্রহণ এফডিএ নির্ধারিত মাত্রার পাঁচ গুণের বেশি হতে পারে। তবে এটি মডেলভিত্তিক হিসাব; গবেষণায় শিশুদের রক্ত পরীক্ষা করা হয়নি।
সিসা একটি বিষাক্ত ভারী ধাতু, যা শরীরে জমে শিশুদের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, রক্তে সিসার কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও উচ্চ রক্তচাপ, কিডনির সমস্যা ও রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি বাড়ায় সিসা। সিসা মেশানো খাবারের আলাদা কোনো রং, গন্ধ বা স্বাদ থাকে না।
তবে গবেষকেরা বলছেন, সব অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রই বিপজ্জনক, এমন নয়। গবেষণাটি মূলত পুরোনো স্ক্র্যাপ ধাতু গলিয়ে তৈরি স্থানীয় পাত্র নিয়ে। আইসিডিডিআর,বির বিজ্ঞানী ড. জেসমিন সুলতানা বলেন, “এসব পাত্র ব্যবহার করতে হলে স্টিলের তারের স্ক্রাবার দিয়ে ঘষা এড়িয়ে চলা উচিত এবং তাতে টক বা অম্লীয় খাবার রান্না না করাই ভালো। এসব সতর্কতাও দূষিত পাত্রকে পুরোপুরি নিরাপদ করে না।”
দেশে অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার পাত্রে সিসার কোনো মানদণ্ড এখনো নেই বলে বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। চট্টগ্রাম অ্যালুমিনিয়াম শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি হারুনুর রশিদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, বেশির ভাগ কারখানাতেই স্ক্র্যাপ ধাতুতে সিসা আছে কি না, তা যাচাইয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই।
বিএসটিআইয়ের পরিচালক মো. আলাউদ্দিন হুসাইন জানান, অ্যালুমিনিয়াম কুকওয়্যার উৎপাদনকারী ৩৯টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দুই দফা বৈঠক করেও কার্যকর সাড়া মেলেনি। পণ্যটি এখন অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের তালিকায় আসায় একটি নিরাপত্তা মান প্রণয়ন করা হবে এবং অভিযান শুরু হবে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, মান নির্ধারণের কাজ সময়সাপেক্ষ হলেও তা চলমান রয়েছে।
তথ্যসূত্র: আইসিডিডিআর,বি, বিজ্ঞানচিন্তা, বিবিসি বাংলা



